
সরকার চালের দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পরেও যেমন চালের দাম কমেনি, ঠিক তেমন অবস্থা দেখা যাচ্ছে আলুর ক্ষেত্রেও। আমাদের দেশে আলুর বাম্পার ফলন হয়। আলু তো আর আমদানি করতে হয় না। প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়, তাতে ভোক্তার চাহিদা মিটিয়ে আলু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। অথচ আলুর এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি! তাহলে এটার রহস্য কি?
হিমাগার পর্যন্ত প্রতি কেজি আলু ২৩ টাকা, পাইকারি বাজারে ২৫ ও খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে কৃষি বিপণন অধিদফতর।
পাশাপাশি একই দরে আলু বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক ও বাজার কর্মকর্তাদের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এই আদেশ অমান্য করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, সরকারের পক্ষ থেকে মিল পর্যায়ে চালের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও ভোক্তারা প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চালে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বাড়তি দিতে বাধ্য হচ্ছে।
আলুর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কি যৌক্তিক কোনো কারণ আছে? মোটেও না। সেই পুরনো সিন্ডিকেটের কারসাজিই মূল কারণ। বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বলছে, আলুর দাম নজরদারি করতে অধিদফতরের টিম হিমাগার থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজারে তদারকি করছে। তাই যদি হয়, তাহলে এই তদারকির ফলাফল কী? তবে কি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নামকাওয়াস্তে তদারকি করছে?
জানা গেছে, বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও হিমাগার থেকে আলু ছাড়া হচ্ছে না। কোনো কোনো অঞ্চলে হিমাগার থেকে ধীরগতিতে আলু সরবরাহ করা হচ্ছে। আলুর দাম অস্বাভাবিক পর্যায়ে উঠে গেলে আলু মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করার বিষয়ে কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সতর্কবার্তা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
শুধু আলু নয়, বস্তুত দেশে সক্রিয় সিন্ডিকেটগুলো নিত্যপণ্যের বাজার জিম্মি করে ফেলেছে। এই সিন্ডিকেটগুলো এতই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সৎ সাহস আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই। আসলে পুরো বিষয়টি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছে। এই চক্র ভাঙ্গার জন্য যে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা দরকার তা অনুপস্থিত। গা-ছাড়া তদারকিতে তাই কিছুই হচ্ছে না।
নিত্যপণ্যের বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে অবশ্যই। প্রকৃতপক্ষে স্বল্প ও সীমিত আয়ের নাগরিকদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। আলু ভর্তা দিয়ে সামান্য ভাত খাবে সেই অবস্থাও নেই তাদের। শাকসবজির দামও এত চড়া যে, সেগুলোও তাদের নাগালের বাইরে।
স্পষ্ট ভাষায় বলা দরকার , মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে এই নয় যে, এতে কোনো শৃঙ্খলা থাকবে না। মুক্তবাজার অর্থনীতিতেও সরকারের একটা নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। সবকিছু যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে সরকারের অস্তিত্ব থাকে কোথায়? এটা কোনো কথা হতে পারে না। উসরকার একটা পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেবে অথচ সেই নির্ধারিত মূল্যে পণ্যটি বিক্রি হবে না। এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশের একশ্রেণির ব্যবসায়ীর দেশাত্মবোধ ও মানবিকতা বলতে কিছু নেই। অর্থলোভই এদের একমাত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মুখের কথা বা উপদেশে তাদের চরিত্র বদল হওয়ার নয়। তাই সরকারকে যেতে হবে কঠোর অবস্থানে। স্বস্তি ফেরাতে হবে স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষদের।