রবিবার, ১৬ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

রবিবার, ১৬ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ রবিবার, ১৬ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২রা আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

দুদক হলো ১ নাম্বার জালিয়াত,ক্ষতিপূরণ চাই-জাহালম

সালেক(আসল আসামী) জাহালম(ভুল আসামী)

প্রভাতী ডেস্ক: বিনা দোষে তিন বছর কারাভোগের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তি পেলেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। রোববার রাত ১২টা ৫৮ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়া হয়।

জানা যায়, পাঁচ বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় জাহালমকে দুদকে হাজির হতে বলা হয়। জাহালম সেই সময় নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিকের কাজ করছিলেন।

যথা সময়ে দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম দুদকের ভুলের কথাটি বুঝানোর চেষ্টা করে আবার তার নরসিংদীর জুট মিলের কর্মস্থলে চলে যান। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের ৩৩টি মামলায় জাহালমের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় দুদক। ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের ওই জুট মিল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের সময় পুলিশকে জাহালম বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ কিন্তু জুট শ্রমিক জাহালমের কোনো কথাই পুলিশ কিংবা দুদক শোনেনি। এর ফলশ্রুতিতে আসল আসামি সালেকের পরিবর্তে জাহালমকেই কারাগারে যেতে হয়।

এ নিয়ে চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে “৩৩ মামলায় ‘ভুল’ আসামি জেলে: ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না…” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৪ সালে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। এর পর সালেককে তলব করে দুদক চিঠি দিলে সেই চিঠি পৌঁছায় জাহালমের টাঙ্গাইলের বাড়ির ঠিকানায়।

নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলের শ্রমিক জাহালম তখন দুদকে গিয়ে বলেন, তিনি আবু সালেক নন, সোনালী ব্যাংকে তার কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আবু সালেকের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও তার নয়।

কিন্তু দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা সেদিন জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোড়াশাল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পরে আদালতেও জাহালম দুদকের পরিচয় বিভ্রাটের বিষয়টি তুলে ধরে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। কিন্তু কেউ তার কথা কানে তুলেননি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কারো কাছে সমাধান না পেয়ে জাহালমের বড় ভাই শাহানূর মিয়া গত বছর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে যান। তার আবেদনে কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে জাহালমের সঙ্গে কথা বলেন কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। পরে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে, আবু সালেক আর জাহালম একই ব্যক্তি নন।

কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মামলার অন্যতম আসামি নজরুল ইসলাম ওরফে সাগরের সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারে কমিশনের কথা হয়। তিনি জানান, আবু সালেক মিরপুরের “শ্যামল বাংলা আবাসন” প্রকল্পের মালিক।

প্রতিবেদনটি সেদিন (৩০ জানুয়ারি) বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। পরে আদালত স্বঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে।

সেই সঙ্গে ‘ভুল আসামির’ কারাগারে থাকার ব্যাখ্যা জানতে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রতিনিধি ও আইন সচিবের প্রতিনিধিকে তলব করেন হাইকোর্ট।

সে অনুযায়ী দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হিসেবে দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান, মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাহিদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন এবং আইন সচিবের প্রতিনিধি সৈয়দ মুশফিকুল ইসলাম রোববার সকালে আদালতে হাজির হন।

আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। অপর দিকে ছিলেন জাহালমের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনা আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত।

শুনানির শুরুতে খুরশীদ আলম খান বলেন, সোনালী ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তথ্য পাওয়ার পর দুদক আবু সালেকের বিরুদ্ধে মামলা করে। দুদক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল জাহিদ মামলার অনুসন্ধান করেন। তার অভিযোগপত্রে জাহালমের নাম উঠে আসে। টাঙ্গাইলের স্থানীয় চেয়ারম্যানরা জাহালমকে শনাক্ত করেন।

এ পর্যায়ে আদালত উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘এ মামলায় যাকে আসামি করা উচিত ছিল, তাকে আসামি না করে সাক্ষী বানালেন। জজ মিয়া নাটক আরেকটি বানালেন নাকি? দুদক একটি স্বাধীন সংস্থা। বাংলাদেশের জন্য দুদকের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

টিআইবি কী রিপোর্ট দিল, সেটা আমাদের কনসার্ন না। কারণ টিআইবিও ভুল করতে পারে। দুদক যদি প্রোপারলি কাজ না করে, তাহলে আমাদের যে উন্নয়ন হচ্ছে তার স্থায়িত্ব থাকবে না। দেশ পাকিস্তান হতে বেশি সময় লাগবে না, আমাদের ভিক্ষা করতে বসতে হবে।

মনে রাখতে হবে, এটি একটি স্বাধীন দেশ। অনেক মামলায় দেখেছি, আপনারা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামার আগেই তাকে নোটিশ দিয়ে দেন। অথচ পরে অনুসন্ধান করে দেখা যায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই নেই।

তাহলে কেন নোটিশ দিচ্ছেন? একজন অপরাধী না হওয়ার পরও জেল খাটতে হল কেন? দুদককে স্বচ্ছ হতে হবে। এরপর জাহালমকে দুদকের ২৬ মামলা থেকে অব্যাহতির দিয়ে রোববারেই তাকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এই আদেশের পাশাপাশি আদালত আগামী ৬ মার্চ বিষয়টি পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করে দেন।

পরে রাতে কারাগারে কাগজ পৌঁছানোর পর জেল সুপার তাকে মুক্তি দেন।

মুক্তি পাওয়ার পর কারাফটকে সাংবাদিকদের জাহালম বলেন, আমি কোনো অপরাধ করি নাই। ৩ বছর দুদক আমারে আটকা রাখছে মিথ্যা মামলা দিয়া। আমি দুদকের কঠিন বিচার চাই। ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে জাহালম বলেন, আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হইছি। আমি ক্ষতিপূরণ চাই রাষ্ট্রের কাছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

বন্দিজীবনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জজ স্যারকে বলছিলাম যে, আমি এই মামলার আসামি না। আমি আবু সালেক (প্রকৃত আসামি) না, আমি জাহালম। কিন্তু তিনি আমার কথা বিশ্বাস যায়নি (করেননি)।

‘জজ সাহেব দেখে বলছেন যে, এই ছবি আর এই ছবি মিলছে, কয় আমি বলে সেই লোক। আর সাক্ষীরাও বলে আমি সেই (আবু সালেক) লোক। কিন্তু আমি তো সেই সময় কোনো কিছুই জানি না।’

বিনা দোষে শাস্তি পাওয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবার বিচার দাবি করে জাহালম বলেন, ‘তাদের বিচার চাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে।’

দুদক প্রসঙ্গে বলেন, দুদক যেভাবে মিথ্যা মামলা দিয়া মানুষরে হয়রানি করতাছে, দুদক হইলো এক নম্বর জালিয়াত। সঠিক তদন্ত না কইরা যেন লোক না ধরে তারা। সঠিক তদন্ত নিয়া তারপর লোকদের মামলার আসামি করুক।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Telegram
WhatsApp
Email
Print