
দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে ৫৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ ও এনইআইআর (NEIR) সিস্টেম চালুর উদ্যোগকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য ‘বিপর্যয় ডেকে আনা সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এই নীতি কার্যকর হলে দেশের কোটি মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়বে, দাম বৃদ্ধি পাবে লাগামহীনভাবে এবং পুরো মোবাইল খাত ধ্বংসের মুখে পড়বে।
এছাড়া ডিবির হাতে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির সেক্রেটারি আবু সাঈদকে মুক্তি না দেওয়া হলে গণআন্দোলনে নামারও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘এনইআইআর বাস্তবায়ন: মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মোবাইল সমিতির সভাপতি আরিফুর রহমান সম্প্রতি এনইআইআর সিস্টেম কার্যকর করা এবং মোবাইল আমদানিতে ৫৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
আরিফুর রহমান বলেন, মোবাইল ব্যবসায় লাভের পরিমাণ খুবই সামান্য, এক লাখ টাকার পণ্য সর্বোচ্চ এক-দুই হাজার টাকার মুনাফায় বিক্রি হয়। সেখানে ৫৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হয়ে যাবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া স্যামসাং এস২৫ আল্ট্রা ফোনের দাম শুল্ক আরোপের পর ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় পৌঁছাবে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
তিনি বলেন, রিকশাচালক, দিনমজুর, এমনকি ছাত্রসমাজ—সবারই ওপর এর প্রভাব পড়বে। এআইয়ের যুগে প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়লে তা দেশের জন্য দুঃখজনক হবে। সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই এটি মেনে নেবে না।
আরিফুর রহমান বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল এবং কিছু উপদেষ্টা-সহকারীর যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট দেশের কোটি কোটি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চক্রান্ত করছে। দেশের মুক্ত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে এনইআইআর স্পষ্টত সাংঘর্ষিক। মাত্র নয় জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারা দেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে।
মাত্র নয়জনকে আমদানির লাইসেন্স দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেন, এই লাইসেন্সের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার করতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার টিকে থাকে।
ব্যবসায়ীরা ট্যাক্স দিতে প্রস্তুত জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা ট্যাক্স দিতে চাই। কিন্তু আমরা কীভাবে দেব—এটার একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিতে হবে।
এনইআইআর সিস্টেমে একটি মোবাইলে একটি মাত্র সিম কাজ করার যে নীতি আনা হচ্ছে, সেটিকেও তিনি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কাজ বলে উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে মোবাইল চুরি হলে ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু এনইআইআর কার্যকর হলে চুরিকৃত সেটে অন্য কোনো সিম কাজ করবে না, ফলে চুরি যাওয়া মোবাইল আর জীবনেও উদ্ধার হবে না।
পাশাপাশি দুটি সিমে বাধ্য করার এই নীতিকে তিনি অপারেটরদের স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবেও দেখেন।
বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশ মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির সেক্রেটারি আবু সাঈদকে ডিবি অফিস থেকে ‘নির্মমভাবে’ তুলে নিয়ে যাওয়ার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, অচিরেই যদি ওনাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া না হয়, পুরো বাংলাদেশে আমরা গণআন্দোলনে যাব।
আরিফুর রহমান বলেন, যদি এরকম একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, ৫ আগস্টের রেকর্ড ভেঙে সব জনগণ রোডে নামবে। তিনি অনুরোধ করেন, যেন জনগণের মতামতকে মাথায় রেখে গণশুনানির আয়োজন করা হয়।
আরিফুর রহমান সরকারের উপদেষ্টাদের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনারা আমাদের সহযোগিতা করুন, এই ব্যবসায়ী সমাজকে বাঁচিয়ে রাখতে। আমরা দেশের উন্নয়নে সবাই ভূমিকা রাখছি।
তিনি ‘অবৈধ’ আখ্যা দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ব্যবসায়ীরা ভ্যাট, ট্যাক্স, যাকাত দিয়ে ব্যবসা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমরা কিছু তরুণ উদ্যোক্তা, মোবাইল ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে ২০২২ সালে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ গঠন করি। এই সংগঠনে বর্তমানে ২০ হাজারেরও বেশি সদস্য বা মোবাইল ব্যবসায়ী যুক্ত আছেন। গ্রাহক প্রতারণা রোধ এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঐক্য এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এই সংগঠন তার যাত্রা শুরু করে।
এসময় বলা হয়, বিটিআরসি ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর সিস্টেম চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ১১ কোটি টাকা দিয়ে সার্ভার ইমপ্লিমেন্টেশনে কাজ করছে। অর্থাৎ ১৬ই ডিসেম্বর থেকে বিদেশ থেকে আনা ফোনগুলো রেজিস্ট্রেশন না করলে ব্যবহার করা যাবে না। যদিও এই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, কোনো ফোন বিক্রি বা অন্যকে দেওয়ার সময় ডিরেজিস্টার করতে হলে আইএমইআই + এনআইডি + সিম নম্বর (এমএসআইএসডিএন/আইএমএসআই) তিনটি তথ্য মিলতে হবে। অনেক ব্যবহারকারীর জন্য এটি অনুসরণ করা কঠিন, বিশেষত যাদের সিম অন্যের নামে রেজিস্টার করা।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, বিদেশ থেকে যখন প্রবাসীরা দেশে ফোন নিয়ে আসবে এবং তা রেজিস্ট্রেশনে যেসব ডকুমেন্ট লাগে তা সংরক্ষণ করা সহজ-সরল এই মানুষগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব। ব্যাগেজ রুলে বিনা শুল্কে একটি ফোন আনার নিয়ম থাকলেও তারা অধিকাংশ সময়ই পরিবারের প্রয়োজনে একাধিক ফোন নিয়ে আসে, সেই ফোনগুলো রেজিস্ট্রেশন করতে বাধার সম্মুখীন হবে। এনইআইআরের গ্রাহক পর্যায়ে সমস্যা সমাধানে বিটিআরসির পর্যাপ্ত সার্ভিস সেন্টার নেই।
সংবাদ সম্মেলনে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। সেগুলো হলো—
১) চুক্তিপত্র সম্পাদনের বাধ্যবাধকতা অপসারণ: মোবাইলফোন আমদানির জন্য লোকাল ম্যানুফ্যাকচারার চুক্তিপত্র সম্পাদনের বাধ্যবাধকতা অপসারণ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মোবাইল ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ দিতে হবে।
২) বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজিস্ট্রেশন: শুধু আমদানিকারক কর্তৃক শুল্ক পরিশোধের পর বিল অব এন্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিটিআরসিতে জমা দেওয়া সাপেক্ষে উক্ত মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজিস্টার্ড হয়ে যাওয়ার পদ্ধতি চালু করা হোক।
৩) অতিরিক্ত সময় প্রদান: অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মোবাইল ব্যবসায়ীদের অবিক্রিত হ্যান্ডসেট বিক্রি সম্ভব না হওয়ায় এনইআইআর উদ্যোগ বাস্তবায়নে অন্তত এক বছর সময় বাড়ানো এবং এ সময়ের মধ্যে বিক্রয় রসিদকে বৈধ নিবন্ধন নথি হিসেবে গণ্য করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
৪) শুল্ক হ্রাসকরণ: বিদেশি মোবাইল হ্যান্ডসেটে ৫৭ শতাংশ ও দেশীয় সংযোজিত হ্যান্ডসেটে ১ শতাংশ শুল্কের বৈষম্য কমাতে আমদানি শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে আনা।
৫) রিটেইল ব্যবসা সম্প্রসারণ রোধ: বাংলাদেশে স্মার্টফোন উৎপাদন বা সংযোজনকারী কোম্পানিগুলোকে খুচরা ব্যবসায় যুক্ত না করার মাধ্যমে বাজারে একচেটিয়াত্ব রোধ ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা।
৬) একটি এনআইডি দিয়ে সর্বোচ্চ ১০টি স্মার্টফোনের রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ: মোবাইল সিমের মতো প্রতি একটি এনআইডির অধীনে ন্যূনতম ১০টি হ্যান্ডসেট রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ প্রদান করার অনুরোধ করছি। রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে শুধু ক্রয়ের রসিদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হবে।
৭) নিজস্ব অর্থায়নে এনইআইআর বাস্তবায়ন: সরকারকে যথাযথ গবেষণা, বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই এবং স্টেকহোল্ডারদের পরামর্শের ভিত্তিতে নিজস্ব অর্থায়নে এনইআইআর সিস্টেম চালু করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সদস্য বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের ব্যবসায়ী শাহাদাত, যমুনা ফিউচার পার্কের ব্যবসায়ী কবির, আজাদ, খুলনার পল্টু, মোতালেব প্লাজার খালেদ, মোতালেব প্লাজার ব্যবসায়ী এহেসান প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সংগঠনের নেতারা বাংলাদেশ মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির সেক্রেটারি আবু সাঈদকে ছাড়িয়ে আনার জন্য ডিবি অফিসে যান।









